“মঠের যে ওই দক্ষিণ ভাগের জমি দেখছিস, ওখানে বিদ্যার কেন্দ্রস্থল হবে। ব্যাকরণ, দর্শন, বিজ্ঞান, কাব্য, অলংকার, স্মৃতি, ভক্তিশাস্ত্র আর রাজভাষা ওই স্থানে শিক্ষা দেওয়া হবে। প্রাচীন টোলের ধরনের ওই বিদ্যামন্দির স্থাপিত হবে।”
-স্বামী বিবেকানন্দ
(সূত্রঃ স্বামী-শিষ্য-সংবাদ; শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী)
স্বামীজীর এই স্বপ্নের বাস্তবায়ন ঘটিয়ে ১৯৪১ সালে আত্মপ্রকাশ করলো রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দির। স্বামীজীর আদর্শকে আশ্রয় করে গড়ে ওঠা এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্বমহিমায় তার পথচলা শুরু করলো, সূচনা হল এক ইতিহাসের যা কালের আবহমানতায় হয়ে রইলো ভাস্বর। এই আবহমানতা ক্ষয়িষ্ণু নয়, চলিষ্ণু হলেও তাতে জমে না ক্লেদরূপ পলি। আবাসিক মহাবিদ্যালয় এই বিদ্যামন্দিরের প্রথম আবাসন আমাদের ‘শ্রীভবন’।
প্রতিষ্ঠালগ্ন হতে আজ পর্যন্ত এই ভবনের ঝুলিতে যেমন সঞ্চিত হয়েছে রামকৃষ্ণ মঠ মিশনের বহু বরিষ্ঠ সন্ন্যাসী মহারাজের পদরজ, তেমনই কতশত বিদ্যার্থীর একনিষ্ঠ পরিশ্রম এবং উজ্জ্বল জীবন গঠনের সাক্ষ্য বহন করছে বিদ্যামন্দিরের ঐতিহ্যমণ্ডিত এই আবাসনটি। এস্থলে একথা অনস্বীকার্য যে, এই ভবনে একাধারে সর্বত্যাগী মহারাজরা যেমন করেছেন পরা বিদ্যার ভজনা সমভাবে বিদ্যার্থীরা করেছে অপরা বিদ্যার্জনের জন্য নিরলস সাধনা। কবিগুরুর চরণাশ্রয়ের অনুধ্যানে মেলে এর সঠিক পরিচয়-
“বহু সাধকের বহু সাধনার ধারা,
ধেয়ানে তোমার মিলিত হয়েছে তারা;
তোমার জীবনে অসীমের লীলাপথে
নূতন তীর্থ রূপ নিল এ জগতে;
দেশ বিদেশের প্রণাম আনিল টানি
সেথায় আমার প্রণতি দিলাম আনি ।”
বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভিন্ন রুচির ছাত্রদের মধ্যে সৌভ্রাতৃত্বের যে নিবিড় বন্ধন বিদ্যামন্দিরের সম্পদরূপে পরিগণিত, নীরবে সেই ভ্রাতৃত্ববোধকে জাগরূক করে তুলে নিভৃতে তাকে লালন করছে শ্রীভবনের প্রার্থনাগৃহ। প্রভাতী প্রার্থনা ও সন্ধ্যাকালীন আরাত্রিকের ওই নির্মল তরঙ্গরাজি জানে সংস্কৃতির সঙ্গমস্থলের হিসেব, পরম করুণাময় ঠাকুরের বেঁধে দেওয়া তানপুরার তারের প্রতিতা টান মনে রেখেছে সন্ন্যাসী ব্রহ্মচারী মহারাজদের সঙ্গে ছাত্রভাইদের আত্মিক যোগসাজুজের কথা, তবলার একটা বোলও ভুলে যায়নি ঠাকুর মা স্বামীজীর পাশাপাশি ছাত্রদের করা নিদ্রাদেবীর আরাধনাকে, মন্দিরার ঠুংঠাং খবর রেখেছে একাসনে বসা দুই ছাত্রের মান-অভিমানের, সমবেত সঙ্গীত মিটিয়ে দিয়েছে সতীর্থদের কত বিবাদ।
যে আসনে উপবিষ্ট সাধু মহারাজদের মন্দ্র মন্ত্রোচ্চারণে একদিন মুখরিত হত ঠাকুরের পূজার পবিত্রক্ষণ, সময়ের বহমানতায় আজ ছাত্রদের সেই আসনে বসে ঠাকুরসেবায় দেওয়া হয়েছে শিলমোহর। কালের নিয়মে এই হয়ে ওঠার পথ যে কখনো কণ্টকাকীর্ণ হয়নি তা নয়, তথাপি বিদ্যামন্দিরের অধিদেবতার আশীষে সেই কণ্টক পর্যবসিত হয়েছে পুষ্পে, কেটে গেছে দুশ্চিন্তার কালো মেঘ। অটুট বিশ্বাসে ভর করেই সুদূর অতীত থেকে বর্তমানেও প্রতিটি ছাত্র সমবেত কণ্ঠে উচ্চারণ করে,-
“মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক,
আমি তোমাদেরই লোক
আর কিছু নয়,
এই হোক শেষ পরিচয় ।”
- শ্রীভবনের আবাসিকবৃন্দ
(২০২৫-২৬)